‘লিসা মাইটনার’ অবহেলিত এক নারী বিজ্ঞানীর নাম

Udvash July 12, 2020

জার্মান তখন ছিলো ইহুদিদের জন্য মৃত্যুকূপ। ধনী-গরিব, ডাক্তার-বিজ্ঞানী সবার জীবনই যেনো হিটলার বাহিনীর কাছে মূল্যহীন। এমন পরিস্থিতিতে আইনস্টাইন, ম্যাক্স বর্ন এর মতো বিজ্ঞানীরা জীবন বাঁচাতে জার্মান ছেড়ে পালাতে হলো। কিন্তু, তখনও দেশ ত্যাগ না করার জন্য অনড় ছিলেন বিংশ শতাব্দীর উজ্জ্বলতম নারী বিজ্ঞানী লিসা মাইটনার। তিনি তখন আবিষ্কারের নেশায় মত্ত। ইতোপূর্বে লিসা মাইটনার এবং বিজ্ঞানী অটো হান আবিষ্কার করেছিলেন প্রোটেকটিনিয়াম(Pa) মৌলটি।

লিসা মাইটনার সারা জীবনই চেয়েছিলেন বিজ্ঞান যাতে মানুষের কল্যাণে আসে এবং সেই উদ্দেশ্যেই কাজ করে গেছেন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত। কিন্তু, তার জন্য মাইটনার’কে সহ্য করতে হয়েছিলো অনেক দুঃখ-কষ্ট। মাইটনার ইহুদি হওয়ায় ১৯৩০ সালে অধ্যাপিকার দায়িত্ব হারান, জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে পালাতে হয়েছে দেশ থেকে,বিজ্ঞানী অটো হানের সাথে গবেষণার কাজ করেও ১৯৪৪ সালে বঞ্চিত হোন নোবেল পুরস্কার থেকে। তারপরেও মাইটনার থেমে যাননি এগিয়ে গেছেন স্বপ্নপানে। আজকের লেখাটি এই লড়াকু নারী বিজ্ঞানীর আরো জানা-অজানা বিষয় নিয়ে। চলো পড়ে নেয়া যাক এক নজরে-

•লিসা মাইটনার’র গবেষণার হাতেখড়ি ৮ বছর বয়স থেকেই। সে সময় তিনি গবেষণার রেকর্ডগুলো বালিশের নিচে রাখতেন। তিনি গণিত ও বিজ্ঞানে ছোট বেলা থেকেই ছিলেন পরদর্শী।

•লিসা মাইটনার মেয়ে বলে পাবলিক ইন্সটিটিউটে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি (সে সময় ভিয়েনায় পাবলিক ইন্সটিটিউটে নারীদের উচ্চশিক্ষার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো)। পরবর্তীতে তিনি তার বাব-মা এর সহযোগীতায় বেসরকারি ইন্সটিটিউটে শিক্ষা অর্জন করেন।

•লিসা মাইটনার ছিলেন অপরূপা নারী, একবার এমিলি ফিশার ইন্সটিটিউটে তাকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি কারণ তার রূপের কারণে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মনোযোগ নষ্ট হতে পারে এমন ধারণা করেছিলো কর্তৃপক্ষ।

•জার্মানির ইহুদি বিরোধী আইনগুলোর কারণে লিসা মাইটনার এক সময় কায়সার উইলহেম ইনস্টিটিউটের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপিকা ও বিভাগীয় প্রাধানের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য হোন এবং একসময় প্রাণে বাঁচতে জার্মান ত্যাগ করেন।

•ধারণা কার হয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত নারী বিজ্ঞানী ছিলেন লিসা মাইটনার; যিনি শিকার হয়েছিলেন চরম লিঙ্গবৈষম্য, অবিচার ও বিশ্বাসঘাতকতার।

•বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাংক এর লেকচারে অংশগ্রহণ করার জন্য অনেক উৎসুক নারী আবেদন করতেন কিন্তু ম্যাক্স প্লাংক কখনো কারো আবেদন গ্রহণ করতেন না। একমাত্র লিসা মাইটনার-ই সেই সৌভাগ্যবতী নারী যার আবেদন ম্যাক্স প্লাংক গ্রহণ করেছিলেন।

•১৯০৭ সালে জার্মান বিজ্ঞানী অটো হানের সাথে লিসা মাইটনারের পরিচয় হয় এবং তারপরে তার দু’জনে একসাথে দীর্ঘ ৩০ বছর গবেষণার কাজ করে গেছেন।

•লিসা মাইটনার ও বিজ্ঞানী অটো হান একসথে কাজ করলেও দু’জনের পরিস্থিতি ছিলো ভিন্ন। মাইটনার প্রথম দিকে কাজের জন্য কোন পারিশ্রমিকই পেতেন না। পরবর্তীতে যা পেতেন তা ছিলো খুবই সামান্য।

•লিসা মাইটনার ছিলেন পদার্থবিদ্যা ও গণিতে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। বিজ্ঞানী হান যখন নিউট্রন দিয়ে ইউরেনিয়ামকে আঘাত করে ক্রিপটন ও বেরিয়াম এর পর্যবেক্ষণ বুঝতে পারছিলেন না তখন মাইটনার তা সহজেই সমাধান করেন।

•লিসা মাইটনার ও অটো হান দু’জনে নিউক্লিয়ার ফিশন আবিষ্কারের সমান দাবিদার হলেও ১৯৪৪ সালে নোবেল কমিটি লিসা মাইটনারকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র অটো হানকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে। নোবেল কমিটির এই ভুলক ‘নোবেল মিসটেক’ নামে পরিচিত।

•লিসা মাইটনার নোবেল পুরস্কার বিজয়ী না হলেও ১৯৬২ সালে নোবেল বিজয়ীদের Lindau Nobel Laureate Meeting -এ অংশগ্রহণের জন্য নোবেল কমিটি লিসা মাইটনারকে আমন্ত্রণ জানান।

•লিসা মইটনার ও অটো হানের নিউক্লিয়ার ফিশনকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা তৈরি করেছিলেন ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’ যেখান থেকে নিউক্লিয়ার ফিশনকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছিলো পারমানবিক বোমা। যে বোমার আঘাতে ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়েছিলো। কিন্তু এতে কোন সমর্থন ছিলোনা এই গবেষক জুটির।

•লিসা মাইটনার নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ১৯৯০ সালে নোবেল কমিটি পূর্বের (১৯৪৪ সালের নোবেল পুরস্কারের নথিপত্র) রেকর্ডগুলো খুলেন। যার তথ্যের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন বিজ্ঞানী মাইটনারকে নোবেল না দেয়ার বিষয়টিকে অন্যায় বলে অভিহিত করেন। লিসা মাইটনার নোবেল পুরস্কার পাননি, বঞ্চিত হয়েছেন নিজের প্রাপ্য থেকে। জীবনের চলার পথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়েছেন নানান দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন। কিন্তু বিজ্ঞান তাঁকে যোগ্য সম্মান দিতে ভুলেননি; ১৯৯৭ সালে রসায়নের আন্তর্জাতিক সংস্থা তার নামে পার্যায়সারণীর ১০৯ নম্বর মৌলটির নাম রাখেন, যার নাম মাইটনেরিয়াম(Mt)। লিসা মাইটনার পৃথিবীর বুকে বেঁচে নেই কিন্তু সারা জীবন বিজ্ঞান জগতে থাকবেন চির অম্লান হয়ে।

Related Articles

What Peopleare saying

Avatar

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *